বরিশালের গুঠিয়া মসজিদ,যে কারণে বিখ্যাত

0

রুহুল আমিন ভূঁইয়া, বিশেষ প্রতিবেদক ★★ ধান, নদী আর খাল এই তিনে মিলে বরিশাল। প্রবাদের মতোই একেবারে সবুজ মলাটে মোড়া বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর শহর বরিশাল। শের-ই-বাংলা, জীবনানন্দ এবং সুফিয়া কামালের মত আরো অনেক গুণীর শহর বরিশাল। ইতিহাসের বাঁকে হারিয়ে যাওয়া নয়; ইতিহাসের পাতায় সগৌরবে সমুজ্জ্বল শহর বরিশাল। আকাশের বুক আলোকিত বাঁকা চাঁদের মতো একটি দ্বীপ- চন্দ্রদ্বীপ। অনেকেরই হয়ত জানা নেই বরিশাল শহরের আদি নাম চন্দ্রদ্বীপ! হাজারো ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক নানা ঐশ্বর্য বুকে ধারণ করে জেগে আছে এই দ্বীপ। শহরের ইট পাথরের অট্টালিকায় বন্দী জীবন, অবিরাম চলতে থাকা যন্ত্রের চাকার সঙ্গে তাল মিলাতে কিংবা যানবাহনের কান ফাটানো ভেঁপু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচারকে অতিষ্ঠ করে তোলে। তবুও আমরা নিরুপায় কেননা জীবন ও জীবিকার তাগিদে মনের বিরুদ্ধে আটকে থাকতে হয় শহুরে জীবনে; কিন্তু এভাবে কতক্ষণ! নিন্দা, ভাল লাগা আর রূপময় স্বপ্নীল পৃথিবীতে ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যেতে মন ছুটে চলে অজানা কোন সৌন্দর্যের হাতছানি পাহাড়, নদী, সাগর ও অরণ্যে। মাঝে মাঝে মন চায় কোন শিল্পের কারুকার্যে হৃদয় রাঙাতে! মনের খোরাক জোগাতেই দূর থেকে দূরে ছুটে চলা। সে চলার পথের এবারের গন্তব্য বরিশাল জেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে নির্মিত বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্স। তবে স্থানীয় ও অন্যান্য লোকের কাছে এটি পরিচিত একালের ‘গুঠিয়া মসজিদ’ নামে। যদিও বাংলাদেশে বহু মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদের মধ্যে কিছু মসজিদ রয়েছে সেগুলো এমনভাবে কারুকার্য নয়নাভিরাম যা দেখলে সত্যই মন ভরে যায়। তেমনই একটি মসজিদ এটি। প্রাকৃতিক ছায়াঘেরা পাখি ডাকা সবুজ গ্রামের ভেতর নির্মিত হয়েছে এই মসজিদ। এই স্থাপত্য কীর্তিটি কেবল বরিশালের জন্য নয়, গোটা দেশের অহঙ্কার।

২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর উজিরপুরের গুঠিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা হযরত শাহ্ সুফী আশরাফ জাহান খানের (র)-এর বংশধর আলহাজ আব্দুল মজিদ সরদার (মরহুম)-এর দ্বিতীয় পুত্র এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু গুঠিয়ার চাংগুরিয়ার নিজ বাড়ির সামনে প্রায় ১৪ একর জমির ওপর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে গুঠিয়া বাইতুল আমান জামে মসজিদ-ঈদগাহ কমপ্লেক্সের নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করেন। প্রায় চার বছর মেয়াদের মধ্যে ২০০৬ সালে উক্ত জামে মসজিদ- ঈদগাহ কমপ্লেক্সে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। তার নির্মাণাধীন সময়কালের মধ্যে তিনি একটি বৃহৎ মসজিদ-মিনার, ২০ হাজার অধিক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ঈদগাহ ময়দান, এতিমখানা, একটি ডাক বাংলো নির্মাণ, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, হেলিপ্যাড, লেক-পুকুর খনন কাজসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ-ফুলবাগান তৈরি ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেন। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্সের মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করলে ডান পাশে রয়েছে একটি পুকুর, পুকুরটির চার পাশ বিভিন্ন রঙের ফুল ও গাছ দিয়ে সাজানো। দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য পুকুর পাড়ের রাস্তা পাকা করে দেয়া হয়েছে। মোজাইক দিয়ে তৈরি শান বাঁধানো ঘাটের বাদাম গাছের নিচে বসে বাতাসের শীতল ছায়ায় শরীর জুড়িয়ে নিতে পারেন ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা। ঘাটের ঠিক উল্টো দিকে মসজিদের প্রবেশ পথে বসানো হয়েছে দুটি ফোয়ারা। রাতে আলোর ঝলকানিতে ফোয়ারাগুলো আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে। মসজিদের তিন পাশে খনন করা হয়েছে কৃত্রিম খাল। মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তিন-চারটি মসজিদের আদলে, তবে হুবহু একই রকম নয়। এটির প্রতিষ্ঠাতা সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু তার কয়েকজন স্থপতি বন্ধুকে নিয়ে যান শারজাহ, দুবাই, তুরস্ক, মদিনা শরিফ, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। স্থপতিরা বিদেশী বিভিন্ন স্থাপত্য কর্মময় মসজিদের আদলে গুঠিয়ায় এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটি উদ্বোধনের পর থেকেই প্রতিদিন অগণিত দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই রয়েছে। মসজিদের সামনের পুকুরটি এমনভাবে খনন করা হয়েছে যাতে পুকুরের পানিতে মসজিদটির পুরো প্রতিবিম্ব দেখা যায়। ২০টি গম্বুজের স্থাপত্যকলায় সাজানো হয়েছে বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্স। মাঝখানের কেন্দ্রীয় গম্বুজের চার পাশে বৃত্তাকারে ক্যালিওগ্রাফির মাধ্যমে লেখা হয়েছে পবিত্র আয়াতুল কুরসি। গোটা মসজিদের ভেতরের চার পাশজুড়ে ক্যালিওগ্রাফির মাধ্যমে লেখা হয়েছে সূরা আর রাহমান। ভেতরের চার কোণের চার গম্বুজের নিচে প্রবেশ তোরণের সামনে এবং ভেতরের দর্শনীয় কয়েকটি স্পটে শোভা পাচ্ছে আল কোরানের বিভিন্ন আয়াত সংবলিত ক্যালিওগ্রাফি। এসব সুদৃশ্য ক্যালিওগ্রাফি এবং আলপনা করা হয়েছে বর্ণিল কাচ, মূল্যবান মার্বেল পাথর, গ্রানাইট ও সিরামিক দিয়ে। ভেতরের নয়টি গম্বুজে বিশালাকৃতির নয়টি অত্যাধুনিক ও মূল্যবান ঝাড়বাতি বসানো হয়েছে। মসজিদটির মিনারের উচ্চতা ১৯৩ ফুট। মসজিদটির মেঝেতে বসানো হয়েছে ভারত থেকে আনা সাদা মার্বেল পাথরের টাইলস। মসজিদটির ভেতরে এক হাজার ৪০০ মুসলি এক সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। বাইরের অংশে আরও পাঁচ হাজার মুসল্লি একত্রে নামাজ পড়তে পারেন। মুসল্লিদের সুবিধার্থে স্থাপন করা হয়েছে বিদেশ থেকে আনা অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। মসজিদের উত্তর পাশে দুই তলা বিশিষ্ট ভবনে রয়েছে কমপ্লেক্সের অফিস, খতিব ও মুয়াজ্জিনের কোয়ার্টার, এতিমখানা ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা। মসজিদটির পূর্ব-দক্ষিণ কোনে আড়াই একর জায়গায় রয়েছে কবরস্থান। পুরো কমপ্লেক্সের আঙিনাজুড়েই রয়েছে ফুলের বাগান, গাড়ি পার্কিং ও হেলিপ্যাড। নিরাপত্তার জন্য কমপ্লেক্সের তিন দিকে মনোরম লেক তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া কাঁটাতারের বেষ্টনী তো আছেই। বিদ্যুত লাইনের পাশাপাশি রয়েছে ১৫০-১৫ কেভিএ শক্তিসম্পন্ন নিজস্ব দুটি জেনারেটর, যার কারণে মসজিদটি রাতে অনেক বেশি নয়নাভিরাম মনে হয়। কারণ এর ভেতরে-বাইরে এমনভাবে আলোকসজ্জা করা হয়েছে যা দর্শনীদের নিয়ে যায় অপার্থিব জগতে। যা দেখে মনে পড়বে মহান স্রষ্টা আল্লাহর কথা আপনা থেকেই মাথা নুয়ে আসতে চাইবে মহান প্রভুর দিকে। সব মিলিয়ে নিপুণ হাতের সুনিপুণ এক সৃষ্টি গুঠিয়ার বায়তুল আমান জামে মসজিদ। মসজিদ কমপ্লেক্সের আরও একটি বিষয় বেশ কৌতূহল জাগানিয়া। প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ পথের বাঁয়ে নির্মিত হয়েছে একটি ¯স্তম্ভ। বিশ্বের ২১টি স্থানের মাটি এবং জমজম কূপের পানি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই স্তম্ভটি। আশ্চর্যকর এই স্তম্ভটি দেখে আরও বেশি আবেগাপ্লুত হন আগত পর্যটকরা। এস সরফুদ্দিন আহমদ সান্টুর উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র স্থানকে পবিত্রতম করার প্রয়াস। রাতের আঁধার নেমে এলেই বায়তুল আমান যেন তার আসল রূপ খুঁজে পায়। সোনালি আলোকসজ্জার মোহনীয়তায় থেমে যান পথিক- অনায়াসে নিজেকে আবিষ্কার করেন বায়তুল আমান চত্বরে। মজার ব্যাপার হলো মসজিদ কমপ্লেক্সের সৌন্দর্যবর্ধন কাজের কীর্তিমান শিল্পী আরিফুর রহমানের বাড়িও সেই বরিশালে। গোটা মসজিদের সিংহভাগ ক্যালিগ্রাফি এবং আঁকাআঁকির কাজ তিনিই করেছেন। এ ছাড়াও এই কাজে তাঁর সঙ্গে সহযোগী হিসেবে ছিলেন আরেক ক্যালিগগ্রাফার বশির মেসবাহ। এই মসজিদটির তত্ত্বাবধানে ৩০ জন কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। মহিলাদের নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। বরিশাল যারা বেড়াতে কিংবা ঘুরতে আসেন তাদের প্রশ্ন থাকে এখানে দেখার মতো কি আছে? এরূপ সবারই আগ্রহ থাকে বরিশাল নামের সঙ্গে মিশে থাকা শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশসহ অন্যান্য মনীষীর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো ঘুরে দেখার। কিন্তু এসব বিশিষ্ট ব্যক্তি ও গুণীজনদের স্মৃতি রক্ষায় এখন পর্যন্ত তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই হতাশ হন এখানে বেড়াতে আসা পর্যটক কিংবা মেহমানরা। এমনি অবস্থায় তাদের নিয়ে যাওয়া যায় গুঠিয়ার বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও ঈদগাহ কমপেপ্লক্স এলাকায়। দৃষ্টিনন্দন ওই এলাকায় ঘুরে মুগ্ধ হবেন আগত অতিথি কিংবা পর্যটকরা। কয়েকজন দর্শনার্থীর বক্তব্য এ মসজিদটি দেখতে এবং নামাজ আদায় করতে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন এখানে। নয়নাভিরাম এ কমপ্লেক্স দেখে অভিভূত হন তারা। ‘অপূর্ব চারপাশে জলাধারের মাঝে যেন ফুটে আছে অনন্য এক স্থাপত্যশৈলী। যা দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। ‘খুব ভাল একটি দর্শনীয় স্থান এটি, দেখতে না পারলে খুব মিস করতাম। এমনিভাবে প্রতিদিন বহু মানুষের আগমন ও তাদের মনোমুগ্ধকর মন্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের সর্বত্র সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে এ মসজিদ ও কমপ্লেক্সের।

Share.

Leave A Reply