১৫ কারণে আ’লীগের জয়,৭ কারণে বিএনপির পরাজয়

0

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির সাত কারণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের ১৫ কারণও উল্লেখ করেন তিনি। জাতির উদ্দেশ্যে শুক্রবার সন্ধ্যায় ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। চতুর্থবারের মতো সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশ্যে এটাই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ।

জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় ছিল খুবই প্রত্যাশিত। অন্যদিকে সাধারণ ভোটাররা বিএনপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার বহু কারণ আছে।

শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন সরকার গঠনের পর এটিই জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ।

৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন উপমন্ত্রী নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো মন্ত্রিসভা গঠন করেন শেখ হাসিনা।

এর আগে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ এবং তার মধ্যে ২৯৮টির ফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৫৯ আসন পেয়েছেন নৌকার প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছে ২৮৮ আসনে।

অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা ধানের শীষ প্রতীকে মাত্র সাতটি আসনে জয়ী হতে পেরেছেন।

আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের কারণগুলো তুলে ধরে দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় ছিল খুবই প্রত্যাশিত। নির্বাচনের আগে দেশি-বিদেশি জরিপগুলিও এ রকমই ফলাফলের ইঙ্গিত দিয়েছিল।

তিনি বলেন, লন্ডন-ভিত্তিক ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট এবং রিসার্স অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট সেন্টারের জরিপের ফল আপনারা লক্ষ্য করেছেন। আমাদের এই ল্যান্ড-স্লাইড বিজয়ের কয়েকটি কারণ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে মোটাদাগে ১৫টি কারণ তুলে ধরেন:

১. বিগত ১০ বছরে দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, সাধারণ মানুষ তার সুফল পেয়েছেন।

২. দশ বছর আগে যে বালক/বালিকাটি হারিকেন বা কুপির আলোয় পড়া-লেখা করত, গ্রামে পাকা রাস্তা দেখেনি, তরুণ বয়সে সে এখন বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় পড়াশোনা করছে, মোটরযানে যাতায়াত করছে।

৩. যে বয়স্ক পুরুষ-নারী পরিবারে ছিল অবহেলিত-অপাংক্তেয়, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা তাকে সংসারে সম্মানের জায়গায় নিয়ে গেছে।

৪. গ্রাম-বাংলার খুব কম পরিবারই আছে, যে পরিবার সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর উপকারভোগী নয়। কোনো না কোনোভাবে প্রতিটি পরিবার উপকৃত হচ্ছে।

৫. কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, ভ্যান বা রিক্সাচালকসহ নিম্নবিত্তের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। ১০ বছর পূর্বে একজন কৃষি শ্রমিক তার দৈনিক মজুরি দিয়ে বড় জোর ৩ কেজি চাল কিনতে পারতেন। এখন তিনি ১০ কেজি চাল কিনতে পারেন।

৬. সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতনভাতা বিগত ১০ বছরে আড়াই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

৭. সরকারি ও বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও সমহারে বেড়েছে। যেমন পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ১৬০০ টাকা থেকে ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৮ হাজার টাকা হয়েছে।

৮. কৃষিজীবীদের সার, বীজসহ বিভিন্ন উপকরণে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।

৯. ব্যবসায় এবং শিল্প-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে একদিকে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে অন্যদিকে রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারিত হয়েছে। যার সুবিধা সাধারণ জনগণ পাচ্ছে।

১০. পদ্মাসেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহাসড়কগুলোকে চার-লেনে উন্নীতকরণসহ মেগা প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হওয়ায় সাধারণ মানুষের বর্তমান সরকারের ওপর আস্থা জন্মেছে।

১২. মানুষ নিজের এবং দেশের মর্যাদা চায়। আমরা বাংলাদেশকে সেই মর্যাদা এনে দিতে পেরেছি। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ৪৬ বছর পর উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা প্রাপ্তি জনগণকেও গর্বিত করেছে। ভিক্ষুকের দেশের দুর্নাম ঘুচেছে। যারা মানুষকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন, তাদের মানুষ মর্যাদা দেবেন- এটাই স্বাভাবিক।

১৩. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের পর থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। প্রতিটি সম্ভাব্য প্রার্থী নিজ নিজ এলাকায় জনসংযোগ বাড়িয়েছেন এবং এলাকার উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। এবারের নির্বাচনে দলের প্রতিটি নেতাকর্মী মনোনীত প্রার্থীর জন্য কাজ করেছেন।

১৪. আমাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি আমরা ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছি।

১৫. নির্বাচনী প্রচারকালে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, শিক্ষাবিদ, সাবেক আমলা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা- সকলেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। একটি সমাজের প্রায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন কোন দলের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন, তখন তাকে কোনভাবেই আটকে রাখা যায় না।

 

বিএনপির ভরাডুবির যেসব কারণের কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী

ভরাডুবির জন্য বিএনপি নিজেরা দায়ী মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের প্রতিপক্ষ জোটের নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে আপনারা ভালোভাবেই জানেন। আমি এ নিয়ে কথা বলতে চাই না। তাদের পরাজয়ের বহুবিধ কারণ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর তুলে ধরা বিএনপি ভরাডুবির কারণগুলো:

১. এক আসনে ৩-৪ জন বা তারও বেশি প্রার্থী মনোনয়ন।

২. মনোনয়ন নিয়ে ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ এবং দুর্বল প্রার্থী মনোনয়ন।

৩. নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন – সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা।

৪. নিজেরা জনগণের জন্য কী করবে, সে কথা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে ক্ষমতায় গেলে আমাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেবে- তাদের প্রচারণায় প্রাধান্য পেয়েছে।

৫. সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা ছাড়া নিজেদের সাফল্যগাথা তুলে ধরতে পারেনি।

৬. ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের দেশব্যাপী অগ্নি-সন্ত্রাস ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি।

৭. সর্বোপরি, বিএনপির ধানের শীষ মার্কায় যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের মনোনয়ন তরুণ ভোটাররা মেনে নিতে পারেনি। তরুণেরা আর যাই হোক স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির পক্ষ নিতে পারে না।

এসব কারণ তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, এ রকম আরও বহু উদাহরণ দেওয়া সম্ভব, যার মাধ্যমে প্রমাণ করা যাবে যে সাধারণ ভোটাররা বিএনপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো এবং নৌকার অনুকূলে এবার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিলো।

Share.

Leave A Reply