সিডর ট্রাজেডিঃ বরগুনার দুই নারীর করুণ কাহিনী!

0

মর্জিনা বেগম,বিশেষ প্রতিনিধি,বরগুনা থেকে ফিরে ★★ আবদুর রশিদের মতো ঘূর্ণিঝড় সিডরে পারুল রানী(৬০)’র সিথীর সিঁদুর এবং মরিয়ম বেগম হারিয়েছে তার নাকের নোলক। জীবন সাথী হারা দুই নারীর জীবন কাটে ভিক্ষা করে আর ধান টোকায়ে।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘটে যাওয়া সেই ভয়াল রাতের কথা ভুলতে পারেন না তারা। ঝড়ে সাগরের তীব্র স্রোতে ঘর,ভিটার মাটি,গবাদিপশুর সাথে ভেসে গেছে তাদের স্বামী না ফেরার দেশে। স্বজনহারা পারুল ও মরিয়মের দিন কাটে পরের বাড়ি কাজ করে,ধান কুড়িয়ে কখনওবা ভিক্ষা করে।
বরগুনার সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের গোড়াপদ্মা গ্রামের বাসিন্দা পারুল রানী। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ঝড়ের দিন তার স্বামী যুগল চন্দ্র সিকদার ভেবেছিল ঝড় তেমন হবে না। তাই পরিবারের সদস্য নিয়ে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য কোথাও যায়নি। পরে বিকেলে প্রতিবেশিরা জোর করে তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যায়। তবে গেলেও যুগল চন্দ্র বাড়ি ছাড়েনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সাগরের তীব্র স্রোত,কাঁদা আর লবনাক্ত পানিতে ভেসে যান তিনি। ঝড় থামার পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর ১৮ নভেম্বর ওয়াবদার কাছে একটি গর্তের মধ্যে যুগল চন্দ্রের মৃতদেহ পাওয়া যায়। সেই সাথে হারিয়ে যায় পারুল রানীর সুখ শান্তি। ব্যক্তিগত জীবনে পারুল রানীর ৩ মেয়ে ও ১ ছেলের মাঝে ১ মেয়ে মারা গেছে। ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন তিনি।এখন একমাত্র দিনমজুর ছেলে সুমন চন্দ্র সিকদার(৩৫)’র একার উপার্জনে সংসার চালানো কঠিন। তাই পারুল রানী অন্যের বাড়িতে ছুটা কাজ করে। কখনও ধান টোকায়। আবার কখনও অন্যের কাছে হাত পেতে পয়সা নিয়ে সংসার চালাতে হয়। মাঝে-মধ্যে উপবাসও থাকতে হয় তাদের। অসুখে ঔষধ জোটে না। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করতে হয়। তিনি আরও জানান,ঝড়ে তাদের ঘর ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সেই সময় খাদ্য সাহায্য পেলেও টাকা দিতে পারেনি বলে পারুল ঘর পায়নি বলেও অভিযোগ করেন। এছাড়া বিধবা ভাতার জন্য ছবি,আই কার্ডসহ অন্যান্য নিলেও আজও তার ভাগ্যে ভাতা জোটেনি। তাই পারুল রানী দাবী করে বলেন, যদি বিধবা ভাতা পাইতাম,তয় উপকার অইতো।
কথা হয় উপজেলার ৯নং বালিয়াতলী ইউনিয়নের দক্ষিন পাতাকাটা গ্রামের ৭৫ বছরের বয়স্ক নারী মরিয়ম বেগমের সাথে। তিনি জানান- ঘূর্ণিঝড় সিডর তার স্বামী আব্দুল আজিজকে কেড়ে নিয়েছে।তাই মরিয়মের দিন কাটে ভিক্ষা করে।
মৃত্যুর ১৪ বছর পূর্বে এক ভুল চিকিৎসায় আব্দুল আজিজের দু’টি চোখই নষ্ট হয়ে যায়। তাই দুঃখ-কষ্টে পাশাপাশি থেকেই দিন কাটতো তাদের। সেই মানুষটিকে সিডর কেড়ে নিয়েছে। চোখে না দেখার কারনে বাঁচার শেষ চেষ্টাও করতে পারেননি তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে ৩ ছেলে ১ মেয়ে থাকলেও দিনমজুর ছেলেরা মায়ের খোঁজ নেয় না। তাই একমাত্র মেয়ের কাছেই থাকেন মরিয়ম। যদিও স্বামীর মৃত্যুর পর তার নামের বয়স্কা ভাতার কার্ডটি মরিয়মের নামে করে দেয়া হয়েছে। তবে সে ভাতার টাকাও তিনি নিয়মিত পান না বলে অভিযোগ করেন।তাছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে তার বসত ঘরটি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তখন। সে সময় যারা টাকা দিতে পেরেছে কেবলমাত্র তারাই ঘর পেয়েছেন। কিন্তু মরিয়ম বেগম টাকা দিতে পারেনি বলে, তার ভাগ্যে ঘর জোটেনি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষটি চোখেও ভাল দেখতে পান না।তবুও পেটের ক্ষুধা মেটাতে লাঠিতে ভর দিয়ে রোদে পুড়ে,বৃষ্টিতে ভিজে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করে দিন কাটান তিনি।খুব আক্ষেপ করে কথাগুলো জানান তিনি।স্বামীহারা মরিয়ম স্বামীকে মনে করে চোখের নিচে পানি জমিয়ে পথ চলেন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
পারুন রানী আর মরিয়মের বিষয় কথা হয় ১০নং নলটোনা ইউনিয়নের সমাজসেবক ও ভাতা কমিটির সদস্য মো.শাহ আলম জাকিরের সাথে। তিনি বলেন,পারুল রানী যাতে বিধবা ভাতা পেতে পারেন তার জন্য চলমান তালিকায় পারুল রানীর নাম অন্তর্ভূক্ত করে দেয়া হবে। তাছাড়া মরিয়ম বেগম যাতে নিয়মিত ভাতা পান সেই বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করবেন।

Share.

Leave A Reply